আলোচনার মাঝপথে আগুন: ইরান হামলা ঘিরে ট্রাম্প, ইসরায়েল ও সৌদির গোপন সমীকরণ



ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হয়েছে নতুন এক অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে—এই হামলা কি হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত, নাকি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ?


বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ইরানের ওপর এই সামরিক অভিযান বহু মাস ধরেই পরিকল্পিত ছিল। অথচ একই সময়ে চলছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা। ঠিক আলোচনার মাঝপথেই হামলা চালানোয় ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ইরানের দৃষ্টিতে এটি কূটনীতির প্রতি আরেকটি বিশ্বাসঘাতকতা।


গত বছরের জুনে নির্ধারিত বৈঠকের ঠিক আগে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ১০ দিনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। এবারও দ্বিতীয় দফা আলোচনার অগ্রগতি যখন ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল, তখনই শুরু হয় আকস্মিক হামলা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানতেন ঝুঁকি আছে, তবুও আলোচনার পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল।


ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি মধ্যস্থতার চেষ্টা চালান। তিনি ওয়াশিংটনে গিয়ে আলোচনার অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেন এবং দাবি করেন, একটি সমঝোতা হাতের নাগালে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হয়নি।


২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে সরে দাঁড়িয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার নতুন আলোচনাও তার পছন্দসই গতি পাচ্ছিল না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে, এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় সামরিক পথ বেছে নেওয়া হয়।


হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। রিপাবলিকান পার্টির বেশিরভাগ নেতা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কিছু সমর্থক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। কংগ্রেসম্যান টম ম্যাসি ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা সীমিত করতে বিল আনার ঘোষণা দিয়েছেন।


ডেমোক্র্যাট নেতারাও হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের—এই যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে। তবে কিছু ডেমোক্র্যাট নেতা আবার খামেনির মৃত্যুকে মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের সূচনা হিসেবেও দেখছেন।


এই হামলার নেপথ্যে সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়েও প্রকাশিত হয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিলেও সৌদি যুবরাজ গোপনে ট্রাম্পকে ইরানে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সৌদি ও ইসরায়েলের এই অস্বাভাবিক সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।


বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যার প্রধান কৌশলগত সুবিধাভোগী হতে পারে ইসরায়েল। বহু বছর ধরেই ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে। যদিও তেহরান বরাবরই পারমাণবিক বোমা তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।


ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি—ইরানের কর্মকাণ্ড মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছিল। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন—সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হুমকি ছাড়া এমন পূর্ণমাত্রার হামলা কতটা ন্যায্য?


ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তেহরানের মতে, এটি তাদের প্রতিরক্ষার অংশ। ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করেছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফও এই কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।


হামলার পর ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা—এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।


এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিক নতুন যুদ্ধ চান না। তবুও প্রশাসনের সিদ্ধান্তে দেশটি আবারও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল।


সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—কূটনীতির পথ কি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল? আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার সম্ভাবনা কি আর আছে? নাকি এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে নতুন অধ্যায় লিখবে?


পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে—দীর্ঘ যুদ্ধ, নাকি অপ্রত্যাশিত কোনো সমঝোতা—তা সময়ই বলে দেবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
🚀 Join Our Telegram Community