আদালতে বিচার আজ টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়—নাটোরের জনসভায় কঠোর অভিযোগ জামায়াত আমিরের

আদালতে বিচার আজ টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়—নাটোরের জনসভায় কঠোর অভিযোগ জামায়াত আমিরের

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেছেন, বর্তমান সময়ে দেশে বিচার ব্যবস্থা ভয়াবহভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং বিচার আজ টাকার বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। তার দাবি, গ্রাম আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত অর্থের প্রভাব বিস্তার করেছে। এ কারণে বড় বড় ঋণখেলাপিরা অনায়াসে রাজনৈতিক মনোনয়ন পাচ্ছে এবং আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকাল সাড়ে ৪টায় নাটোর এনএস সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যদি বিচার সত্যিকার অর্থে ন্যায়সংগত হতো, তাহলে কীভাবে বড় বড় ঋণখেলাপিরা বারবার রাজনৈতিক আশ্রয় পায়? বিচার ব্যবস্থা আজ দুর্বল নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী যদি কখনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে দেশে প্রকৃত শাসনব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে। তার ভাষায়, “একজন সাধারণ মানুষ কোনো অপরাধ করলে আইনে যে শাস্তি রয়েছে, একই অপরাধ যদি প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি করেন, তার ক্ষেত্রেও একই শাস্তি কার্যকর হবে। আইনের চোখে কেউ বড় বা ছোট হবে না।”

ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত বিচার দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। “এই জাতি তাকিয়ে আছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে। আমরা সেই বিচার প্রতিষ্ঠা করবো—ইনশাআল্লাহ,” বলেন তিনি।

রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, “একটি দল কেয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তারা পারেনি। কেউ চাইলেও কেয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।” তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে ক্ষমতাসীনরা বিরোধী মত দমনের জন্য মানুষকে ধরে নিয়ে গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়েছে। “শেষ পর্যন্ত তাদের পতন হয়েছে। ইতিহাসের এই শিক্ষা কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না,” বলেন তিনি।

জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, জামায়াত কখনো এককভাবে ক্ষমতার কৃতিত্ব নিতে চায় না। “জামায়াতের কোনো একক বিজয় নেই। আমাদের সব বিজয় দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়,” বলেন তিনি। তার মতে, দেশকে রাজনৈতিক সংঘাত ও বিভাজনের দিকে ঠেলে না দিয়ে ঐক্যের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে চায় জামায়াতে ইসলামী। এজন্য তাদের স্লোগান—‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’

তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে। “আমরা কাউকে ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে বিভক্ত হতে দেবো না,” উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও ব্যাংক লুটের বিরুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান জিরো টলারেন্স। “আমরা চাঁদাবাজি করি না, কাউকেও করতে দেবো না। দুর্নীতিবাজদের কোনো আশ্রয় দেওয়া হবে না,” বলেন তিনি।

অতীতের সরকারগুলোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা আগে ক্ষমতায় ছিল তারা নিজেদের পকেট ভরেছে। ব্যাংক ও বিমা খাত লুট করেছে, বড় বড় মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি করেছে। “এই দুর্নীতির টাকা দেশে না রেখে বিদেশে পাচার করা হয়েছে,” অভিযোগ করেন তিনি। জামায়াত ক্ষমতায় এলে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

নারীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও কথা বলেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “মায়েদের জন্য ঘরে, চলাচলে ও কর্মস্থলে সর্বত্র মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কোনো জালিম সাহস করবে না নারী জাতির কারও দিকে কুদৃষ্টি দিতে।” নারীবান্ধব ও নিরাপদ সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

নাটোর জেলা জামায়াতের আমির ড. মীর নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক রাশেদ প্রধান, ডাকসুর সাবেক ভিপি মোহাম্মাদ ইব্রাহিমসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা।

জনসভায় বক্তারা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে সমালোচনা করেন এবং আগামী দিনে দেশে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
🚀 Join Our Telegram Community