জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগ অস্বীকার ছরওয়ারে আলমের, জামিনে মুক্ত
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন বঙ্গভবনের কর্মী ছরওয়ারে আলম। আদালতে হাজির হয়ে তিনি দাবি করেন, এই ঘটনার সঙ্গে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তিনি নিজ হাতে এমন কোনো কাজ করেননি। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে জামিন শুনানির সময় ছরওয়ারে আলম এসব কথা বলেন। এর আগে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে হাতিরঝিল থানার একটি সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার সালেহ্ আবু নাইম তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
শুনানিতে আসামিপক্ষে আইনজীবী মো. আলমগীর জামিন চেয়ে আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ছরওয়ারে আলমকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তার মক্কেল একজন নিয়মিত চাকরিজীবী, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন এবং আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। জামিন পেলে তিনি নিয়মিত হাজিরা দেবেন এবং মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দেন আইনজীবী।
অন্যদিকে, বাদীপক্ষে জামায়াতপন্থি আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক জামিনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতে বলেন, আসামি স্বৈরাচারী সরকারের পেতাত্মা হিসেবে কাজ করেছেন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তার ভাষায়, “জামায়াত আমিরের মতো একজন সম্মানিত ব্যক্তির আইডি হ্যাক করে নারী বিদ্বেষী পোস্ট দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বিশেষ করে নারী ভোটারদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।” তিনি তদন্ত কর্মকর্তার রিমান্ড না চাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং আসামির জামিন না দেওয়ার দাবি জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জহিরুল ইসলামও জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, যেহেতু আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাই তাকে আপাতত কারাগারে পাঠানো হোক। প্রয়োজন হলে পরে তদন্তের স্বার্থে রিমান্ড চাওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একপর্যায়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে নিজেই বক্তব্য দেন ছরওয়ারে আলম। তিনি বলেন, “আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলছি, এ কাজ আমার দ্বারা হয়নি। আমি এমন কাজ কল্পনাও করতে পারি না। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছি, আমার মানসিকতা কখনোই এ ধরনের নয়।” তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ মনে করছে তিনিই হ্যাক করেছেন, যা তার জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক। তবে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন বলেও তিনি আদালতকে আশ্বস্ত করেন।
বিচারকের প্রশ্নের জবাবে ছরওয়ারে আলম জানান, তাকে বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় ছিল রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে। তিনি বলেন, স্বেচ্ছায় নিজের মোবাইল, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তার চাকরির আর মাত্র এক বছর বাকি রয়েছে এবং এমন কাজ করে তিনি নিজের পেনশন ও সম্মান নষ্ট করবেন—এটা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না।
শুনানি শেষে বিচারক আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন এবং পরে ছরওয়ারে আলমের জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনের খবরে আদালতে উপস্থিত তার স্ত্রী শামীম আরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানান। দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আগেই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শামীম আরা তার স্বামীকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, “তিনি ৩২ বছর ধরে সম্মানের সঙ্গে চাকরি করেছেন। এটা তো একটা শিশুও বোঝে—কোনো হ্যাকার কি নিজের ঠিকানা দিয়ে হ্যাক করবে? তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন।”
উল্লেখ্য, এ মামলার বাদী জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলাম। গত শনিবার জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি ‘নারী বিদ্বেষী’ পোস্টকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দলের আমিরের এক্স হ্যান্ডেল হ্যাক করে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানায়। এরই ধারাবাহিকতায় মধ্যরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের অভিযানে মতিঝিল এলাকা থেকে ছরওয়ারে আলমকে আটক করা হয়।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে।
