জামায়াতের সঙ্গে জোট হলেও বাংলাদেশ ধর্মরাষ্ট্র হবে না—বিদেশি গণমাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা এনসিপি আহ্বায়কের
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করলেও বাংলাদেশ কোনোভাবেই ধর্মরাষ্ট্রে পরিণত হবে না—এমন স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যৎ সরকার হবে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করাই হবে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ভারতের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘দ্য উইক’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
দিল্লির ব্যুরোপ্রধান নম্রতা বিজি আহুজাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে জানান, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক কোনো আদর্শিক একীভূতকরণ নয়, বরং এটি একটি নির্বাচনী সমঝোতা মাত্র। তিনি বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক। এই আদর্শের বিরুদ্ধে কোনো কর্মকাণ্ড হলে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে আমরা এক মুহূর্তও দেরি করব না।”
নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে তাদের অতীতের কট্টর অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে এবং এখন তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও জাতীয় ঐক্যের কথা বলছে। তার ভাষায়, “তারা এখন একটি জাতীয় সরকারের কথা বলছে, যেখানে সব শ্রেণি ও ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে।” তবে একই সঙ্গে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন, এনসিপি কোনোভাবেই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমর্থন করে না।
জোট রাজনীতির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, বিষয়টি এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচনী সহযোগিতা এবং নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনে এসব বিষয় দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিফলিত হবে। আসন্ন নির্বাচনে এনসিপি জোটগতভাবে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বলেও জানান তিনি।
নাহিদ ইসলামের মতে, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির জন্য এই জোট একটি কৌশলগত প্রয়োজন। তিনি বলেন, “আমরা সংসদের ভেতরে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরতে চাই। নতুন দল হিসেবে এককভাবে নির্বাচনে টিকে থাকা কঠিন। এই বাস্তবতা থেকেই সমঝোতার পথে যেতে হয়েছে।”
তিনি জানান, শুরুতে এনসিপি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং এর পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র কাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি আদর্শিক একাকিত্বের চেয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তার অভিযোগ, পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো আবারও সংগঠিত হয়ে সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। “এই গোষ্ঠীগুলো পরিবর্তনের ধারাকে থামিয়ে দিতে চায়,” বলেন তিনি।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সাক্ষাৎকারে কঠোর অবস্থান নেন এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে হলে দিল্লিকে তার পুরোনো নীতি বদলাতে হবে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ থেকে সরে আসার দাবি জানান তিনি।
সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান দাবি হবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা। তার ভাষায়, “ভারত যদি শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।” এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাহিদ ইসলাম মনে করেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা অভিজ্ঞ দলগুলোর ব্যর্থতায় হতাশ। ফলে এখন তারা তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “আমরা রাজপথের আন্দোলনকে সংসদের ভেতরে নিয়ে যেতে চাই। মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রূপ দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”
সব মিলিয়ে, বিদেশি গণমাধ্যমে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে বোঝাতে চেয়েছেন—জামায়াতের সঙ্গে জোট হলেও এনসিপি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে যাবে না। বরং তারা গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও তরুণ নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ে তুলতে চায়।
.jpg)