চট্টগ্রাম বন্দরের আন্দোলনকারীদের সম্পদ তদন্ত ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দুদকে আবেদন
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আন্দোলনরত ১৫ জন কর্মচারীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে এসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করার অনুরোধ করা হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে বন্দর অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা একটি চিঠির মাধ্যমে এই আবেদন জানানো হয়। চিঠিটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এর অনুলিপি নৌপরিবহন উপদেষ্টার দপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণার পরপরই এই চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান লাগাতার কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। বন্দর ভবনে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর সংগঠনের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নৌ উপদেষ্টা আশ্বাস দিয়েছেন যে দাবি-দাওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে আশ্বাস বাস্তবায়ন না হলে আগামী রোববার থেকে আবারও কর্মবিরতি শুরু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠিতে যেসব কর্মচারীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন। এর আগে তাদের দুজনকে প্রেষণে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। তালিকায় আরও যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন— মো. ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. জহিরুল ইসলাম, খন্দকার মাসুদুজ্জামান, মো. হুমায়ুন কবীর (এসএস পেইন্টার), মো. শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মো. শামসু মিয়া, মো. লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল এবং মো. রাব্বানী।
চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, উল্লিখিত কর্মচারীরা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এতে উল্লেখ করা হয়, “উক্ত কর্মচারীগণ রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত। এ সকল বিপথগামী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও এজেন্সিকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।” এই বক্তব্য ঘিরে শ্রমিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া চিঠির ‘শুধু দুদকের জন্য’ অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উল্লিখিত কর্মচারীদের সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু প্রশাসনিক নয়, আর্থিক ও দুর্নীতির দিক থেকেও এসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের আন্দোলন ও কর্মবিরতি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এখানকার যেকোনো অচলাবস্থা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
চিঠিতে উল্লেখিত বিষয় নিয়ে বক্তব্য জানতে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি ব্যস্ত আছেন এবং পরে কথা বলবেন। তবে রাত ১১টার দিকে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের একাংশের দাবি, তাদের যৌক্তিক দাবিকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা অনভিপ্রেত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সম্পদ তদন্ত ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ নতুন করে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম বন্দরের আন্দোলন, কর্মবিরতি স্থগিত এবং একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের উদ্যোগ—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে বন্দরের পরিস্থিতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের কী ধরনের সমাধান আসে, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
